Friday, December 30, 2011

যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবি ॥ জনসমুদে গর্জন


যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবি ॥ জনসমুদে গর্জন



০ রাজধানী ছিল মিছিলের নগরী
০ ৭ জানুয়ারি সকল জেলায় ও ১১ জানুয়ারি প্রত্যেক উপজেলায় গণমিছিল ও সমাবেশ
০ প্রত্যেক এলাকায় বীর মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও ক্ষতিগ্রস্তদের সম্মান জানানো হবে
উত্তম চক্রবর্তী ॥ অনেকদিন পর যেন রাজধানীবাসী দেখল জনসমুদ্রের গর্জন! আর এই সমুদ্রের গর্জন ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। বুধবার লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে মহাজোটের গণমিছিলে যেন থমকে গিয়েছিল ঢাকা মহানগরী। জাতীয় প্রেসক্লাব, মৎস্যভবন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে শাহবাগ, হোটেল রূপসী বাংলা ও কাটাবন পর্যন্ত দীর্ঘ পথই ছিল জনতরঙ্গ। যেন জনতরঙ্গের শুরু আছে, শেষ নেই। জনতরঙ্গ থেকে ভেসে আসা লাখো মানুষের গগনবিদারী একই সেস্নাগান- 'বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের ঠাঁই নাই', বীর বাঙালী ঐক্য গড়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কর'। গণমিছিল শেষে বিশাল জনসমাবেশে মহাজোটসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী লাখো মানুষ দু'হাত তুলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেন।জনসমুদ্রের সামনে শপথবাক্য পাঠ করিয়ে মহাজোটের শীর্ষ নেতারা ঘোষণা দেন, যতদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন না হবে ততদিন রাজপথ ছেড়ে যাবে না মহাজোটের নেতাকমর্ীরা। সারাদেশের পাড়া-মহল্লা, শহর-বন্দরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পৰে স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মানুষকে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেন, স্বাধীনতাবিরোধীদের মুখপাত্র খালেদা জিয়া যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করুক না কেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে সম্পন্ন করে বাঙালী জাতিকে অভিশাপমুক্ত করবই। এমন বাঁধভাঙ্গা মানুষের গণজোয়ার অনেকদিনই দেখেনি রাজধানীবাসী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন এবং যুদ্ধাপরাধীদের রৰায় মাঠে নামা বিএনপি-জামায়াত জোটের সব ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শপথে রাজধানীতে লাখো মানুষের বাঁধভাঙ্গা স্রোত নামিয়ে বুধবার বড় ধরনের শোডাউন করেছে ৰমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন চৌদ্দ দলসহ মহাজোট। মহাজোটের ডাকে এই গণমিছিলে শরিক হয়েছিলেন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধসহ দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবধরনের শ্রেণী-পেশার মানুষ। মহাজোটের বাইরে যুগপৎ কর্মসূচীর অংশ হিসাবে একই দাবিতে ঢাকা মহানগরীতে পৃথক লাল পতাকা মিছিল ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।একাত্তরের মতোই বুধবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এক অন্যরকম গণজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে। এই উদ্যানেই ১৯৭১ সালের সাতই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বজ্রকঠিন নির্দেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক হানাদারবাহিনীর ওপর, দীর্ঘ নয় মাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর এই স্থানটিতেই পাক হানাদারবাহিনীর লাখো সদস্য আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল বীর বাঙালীর কাছে। সেই ঐতিহাসিক সোহরাওয়াদর্ী উদ্যানের সামনে বুধবার গণমিছিল শেষে একাত্তরের ৭ মার্চের মতোই লাখো বীর বাঙালী দু'হাত তুলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ গ্রহণ করেন। আর এই শপথবাক্য পাঠ করান চৌদ্দ দলের সমন্বয়ক, সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। লাখ লাখ মানুষ দু'হাত তুলে শপথবাক্য পাঠ করে বলেন, 'আমরা শপথ করছি যে, ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে জাতি-ধর্ম, গোত্র-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাকহানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, যে কোন মূল্যের বিনিময়ে তা সমুন্নত রাখব। আর স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাসহ মা-বোনদের হত্যা, ধর্ষণ, অগি্নসংযোগ ও লুটপাট করেছে, সেসব হনত্মারক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবই। দেশ থেকে জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে নিমর্ূল করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করব। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধিশালী বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবই।'শপথ গ্রহণ শেষে জনসমুদ্র থেকে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী গোলাম আযম-নিজামী-সাঈদী-সাকাদের ফাঁসির দাবিতে গগনবিদারী সেস্নাগান পুরো এলাকাকে প্রকম্পিত করে তোলে। শপথ গ্রহণের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যনত্ম রাজপথে থাকার অংশ হিসেবে মহাজোটের পরবতর্ী কর্মসূচী ঘোষণা করেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার মতোই আগামী ৭ জানুয়ারি দেশের সব জেলায় এবং ১১ জানুয়ারি দেশের সব উপজেলায় গণমিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক এলাকায় শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও ৰতিগ্রসত্মদের সম্মান জানানো হবে।গণমিছিল ও সমাবেশ শেষে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা থেকে আগত গণমিছিলে আনা কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, সাঈদী ও সাকা চৌধুরীদের নানা ঢঙের কুশপুতুল দাহ করার আগে জুতা ও থুথু নিৰেপের মাধ্যমে তাদের প্রতি চরম ঘৃণা ও ধিক্কার জানান নেতাকর্মীরা। এ দীর্ঘ পথের বিভিন্ন স্থানে কুশপুতুলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেস্নাগানে সেস্নাগানে প্রকম্পিত করে মহাজোটের নেতারা সেখানে এক অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি করে।গণমিছিলের প্রস্তুতি ছিল ব্যাপকই। কিন্তু কর্মসূচীতে এমন গণবিস্ফোরণ আয়োজকদেরও হতবাক করে দেয়। প্রথমে এই গণমিছিল ও সমাবেশ চৌদ্দ দলের পৰ থেকে করার কথা ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর জাতীয় পার্টিরও এ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের ঘোষণা কর্মসূচী সফলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।সকাল থেকেই সাজসাজ রব পড়ে গণমিছিলের। সোহরাওয়াদর্ী উদ্যানের শিখা চিরনত্মনের চতুর্দিকে এত মানুষের স্থান সঙ্কুলান হবে না এটা অাঁচ করতে পেরে মহাজোট নেতারা স্থান পরিবর্তন করে সোহরাওয়াদর্ী উদ্যানের সামনের রাসত্মায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে বিরাট মঞ্চ তৈরি করেন। এদিকে শাহবাগ থেকে শুরম্ন করে মৎস্যভবন হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাব পর্যনত্ম কয়েক শ' মাইক লাগানো হয় আগে থেকেই।মহাজোট আয়োজিত গণমিছিল শেষে সমাবেশের মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল- 'যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এবং তাদের রৰায় সব চক্রানত্ম নস্যাত ও দেশে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির লৰ্যে বিএনপি-জামায়াত জোটের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা এবং আইনের শাসন, শানত্মি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার লৰ্যেই এই গণমিছিল ও সমাবেশ। সমাবেশের শুরম্নতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব সদ্য প্রয়াত জাতীয় নেতা আবদুর রাজ্জাকের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।দুপুর দুইটার দিকে ঢাকা মহানগরীর ৪৬টি থানা, এক শ'টি ওয়ার্ড, ১৭টি ইউনিয়ন এবং ১৫টি নির্বাচনী এলাকা থেকে একযোগে গণমিছিল সোহরাওয়াদর্ী উদ্যানের দিকে যাত্রা শুরম্ন করলে কার্যত পুরো ঢাকাই যেন কিছু সময়ের জন্য থমকে যায়। মহাজোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের সহযোগী ও ভাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অজস্র সংগঠন মিছিল নিয়ে আসতে থাকে সমাবেশস্থলে। বিশেষ করে অসংখ্য ব্যানার, ফেস্টুন ও বিশাল বিশাল জাতীয় পতাকা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের উদ্যোগে কয়েক শ' রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা গণমিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হলে এলাকার পুরো পরিবেশই যেন পাল্টে যায়।বেলা তিনটায় সমাবেশ শুরম্নর আগেই মৎস্যভবন থেকে শাহবাগ মোড় পর্যনত্ম দীর্ঘ এলাকা কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন বাদ্যবাজনার তালে তালে, যুদ্ধাপরাধীদের কুশপুতুল এবং একাত্তরে তাদের ভূমিকার নানা সচিত্র ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শত শত মিছিলের স্রোতে পুরো এলাকায় রীতিমতো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সমাবেশের মঞ্চ থেকে চৌদ্দ দলের মহানগরীর সমন্বয়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে বার বার স্থান সঙ্কুলানের অভাবের কথা তুলে ধরে গণমিছিলে থাকা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মঞ্চের দিকে না এসে যে যেখানে আছেন সেখানেই বসে পড়ার অনুরোধ করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে গণমিছিলের মিলনস্থল সোহরাওয়াদর্ী উদ্যাদের দুই বর্গকিলোমিটার এলাকায় যেন মানুষের বাঁধভাঙ্গা স্রোত নামে। একপর্যায়ে একদিকে জিরো পয়েন্ট, পল্টন, জাতীয় প্রেসক্লাব ও মৎস্যভবন হয়ে সোহরাওয়াদর্ী উদ্যান এবং অন্যদিকে হোটেল রূপসী বাংলা, কাঁটাবন, শাহবাগ হয়ে সমাবেশস্থল এই পুরো এলাকাই লোকে লোকারণ্য হয়। হাজার হাজার মিছিল থেকে একই সেস্নাগান ও দাবি উচ্চকিত হয়েছে আর তা হলো- 'যুদ্ধাপরাধীদের ৰমা নাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই', খালেদা-নিজামী ভাই ভাই, তাদেরও ফাঁসি চাই', বঙ্গবন্ধুর বাংলায় রাজাকারদের ঠাঁই নাই' ইত্যাদি। গণমিছিলে অংশ নেয়া অসংখ্য ট্রাকে মঞ্চ বানিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, একাত্তরের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাড়া জাগানিয়া দেশাত্মবোধক গান পরিবেশ করতেও দেখা গেছে।


ঢাকা মহানগরীর ১৫টি আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে আসা বিশাল বিশাল মিছিল নগরবাসীর দৃষ্টি কাড়ে। বিশেষ করে সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আসলামুল হক আসলাম, ইলিয়াসউদ্দিন মোলস্না, ডা. মোসত্মফা জালাল মহিউদ্দিন, কামাল আহমেদ মজুমদার, হাবিবুর রহমান মোলস্না, এ্যাডভোকেট সানজিদা খানম ও আসাদুজ্জামান খান কামালের নেতৃত্বে আসা বিশাল বিশাল মিছিল ছিল উলেস্নখ করার মতো। চৌদ্দ দলের সহযোগী সংগঠনের সমন্বয়ে গড়া কেন্দ্রীয় যুব সংগ্রাম পরিষদ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে বিশাল দুটি যুব ও ছাত্রদের মিছিল সবার দৃষ্টি কাড়ে। এছাড়া আসন্ন বিভক্ত দুই সিটি কর্পোরেশনে সম্ভাব্য কমিশনার পদে মনোনয়ন প্রত্যাশী মহাজোটের বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের নেতৃত্বে আসা বড় বড় মিছিল কর্মসূচীতে গণবিস্ফোরণ ঘটাতে ভূমিকা রাখে।
গণমিছিলে নেতৃত্ব ও সমাবেশের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মতিয়া চৌধুরী, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সতীশ চন্দ্র রায়, মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মেজবাহ উদ্দিন সিরাজ, বিএম মোজাম্মেল হক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ড. হাছান মাহমুদ, এ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, ক্যাপ্টেন (অব) এবি তাজুল ইসলাম, মৃণাল কানত্মি দাস, অসীম কুমার উকিল, হাবিবুর রহমান সিরাজ, হুইপ আসম ফিরোজ, ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা এমপি, সুজিত রায় নন্দী, এমএ আজিজ, এ্যাডভোকেট কামরম্নল ইসলাম, জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু এমপি, জাসদের হাসানুল হক ইনু, শরিফ নুরুল আম্বিয়া, শিরিন আকতার, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, গণতন্ত্রী পার্টির নুরম্নর রহমান সেলিম, সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া, ন্যাপের এ্যাডভোকেট এনামুল হক, মির্জা আজম এমপি, হাজী মোহাম্মদ সেলিম, পংকজ দেবনাথ, আশরাফুন্নেসা মোশাররফ এমপি, শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ।

Tuesday, December 27, 2011

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে বিএনপি সরকারের সম্পৃক্ততা ছিল

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সম্পৃক্ততারP অভিযোগ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি এখনো বিশ্বাস করি এটা প্রকাশ্য দিবালোকের মতো সত্য যে সরকারের মদদ ছাড়া এ ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে না। পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিলো। তাতে কোনো সন্দেহ নেই।' রোববার সকালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, 'রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। গ্রেনেড মেরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শেষ করে দেবে এটা হবে না। এজন্যই ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারের রায় বাংলার মাটিতে কার্যকর করা হবে। যেভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে, সেভাবে
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারও করা হবে।' তিনি বলেন, 'আমি রাজনীতি করি এ দেশের মানুষের জন্য। তাই আল্লাহ হয়তো সেদিন আমাকে রক্ষা করেছেন, আমার হাত দিয়ে ভালো কিছু করানোর জন্য।' ১৯৮২ সালে চট্টগ্রামে আমাকে হত্যার উদ্দেশে গুলি চালানো হয়েছিল। সেদিনও ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছিল। তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, এদেশের মানুষের ভাল কিছু করতেই মহান আলাহতালা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এদেশের মানুষের জন্য সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছি। আমার পিতা এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ করে গেছেন। তাঁর আদর্শ আমার প্রেরণা। তিনি জনগণের কাছে তাদের কল্যাণে সবসময় কাজ করে যাওয়ার দোয়া কামনা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, 'তখনকার সময় যারা ক্ষমতায় ছিলো তারা এ হামলার সুষ্ঠু তদন্ত করেনি। উল্টো সকল আলামত নষ্ট করে দিয়েছিলো। অবিস্ফোরিত গ্রেনেড আলামত হিসাবে সংরক্ষিত না রেখে ধ্বংস করা হয়েছিলো। তাহলে সত্য লুকানোর জন্যই কি এগুলো করা হয়েছিলো।' জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা আর যাতে না ঘটে- সেজন্য সরকারে আসার পর আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। যত বাধাই আসুক জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান চালিয়ে যাবো।'
তিনি বলেন, 'সন্ত্রাস জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা সেদিন র্যা লি করছিলাম। ওই দিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনও তৎপরতা দেখিনি। অথচ এমনিতে আমরা সভা সমাবেশ করতে গেলে পুলিশ ঘিরে রাখতো। কিন্তু ওইদিন পুলিশের তৎপরতা ছিল না। এমনকি গ্রেনেড হামলার পরে আহত-নিহতদের সাহায্যের জন্যও তারা এগিয়ে আসেনি। উল্টো আমাদের দলের যারা আহত-নিহতদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল তাদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে।'
পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ছুঁড়বে কেন প্রশ্ন করে তিনি বলেন, 'নিশ্চয় হামলাকারী ঘাতকদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করতে পুলিশ এটা করেছিল। গ্রেনেড হামলায় আহতদেরও হাসপাতালে ঠিক মতো চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। ঢাকা মেডিকেলে সেইদিন তেমন ডাক্তারও ছিলো না। বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে আহতদের ভর্তি করতে চায়নি।' তিনি বলেন, 'এ ঘটনার বিচার না করে তখন জর্জ মিয়াকে নিয়ে নাটক সাজানো হয়েছিলো। জর্জ মিয়ার একার পক্ষ্যে এতো গ্রেনেড বহন করা কি করে সম্ভব ছিলো।'

২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা স্মরণ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, "আমি বক্তব্য শেষে মাইক রেখে সিড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি। তখন গোর্কি (যুগান্তরের প্রধান ফটোসাংবাদিক এস এম গোর্কি) আমাকে বললো, 'আপা একটু দাঁড়ান। আমি ছবি নিতে পারিনি।' আমি দাঁড়ালাম। তখনই হামলা শুরু হলো। আমার পাশে হানিফ ভাই (ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ) ছিলেন। গ্রেনেডের যে স্পি¬ন্টার আমার গায়ে লাগার কথা ছিলো, তা উনার গায়ে লেগেছিলো। টপ টপ করে রক্ত আমার গায়ে পড়ছিলো।"
২১ অগাস্টের হামলায় নিহত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলামের (আদা চাচা) কথা স্মরণ করে করে শেখ হাসিনা বলেন, "ঝড়-বৃষ্টি যাই থাকুক না কেন, আওয়ামী লীগের সকল সমাবেশেই আদা চাচা উপস্থিত থাকতেন।শেখ হাসিনা নিহত ও আহতদের স্মরণ করে বলেন, 'আমি বক্তব্য শেষ করে সামনের দিকে পা বাড়িয়েছি তখনই হামলাগুলো হলো। একে পর এক গ্রেনেড পড়তে থাকে। ১২/১৩টি গ্রেনেড এসে পড়ে ছিলো। আমার পাশে হানিফ ভাই (ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ) ছিলেন। তিনি আমাকে আড়াল করে রাখেন। গ্রেনেডের স্প্রিন্টার আমার গায়ে না লেগে ওনার গায়ে লেগেছিলো। হানিফ ভাইয়ের সারাগায়ে রক্ত ঝড়ছিলো, সে রক্ত আমার গায়ে এসে পড়ে। 
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাহারা খাতুন, ওবায়দুল কাদের, মতিয়া চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন।